September 26, 2021

Sylhet Amar Sylhet

www.sylhetamarsylhet.com

ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না সিলেটের রাফির

ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপ যেতে চেয়েছিলেন তরুণ রাফি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় পাড়ি জমান বেলারুশে। উদ্দেশ্য একটাই সেখান থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশ করা। দালালের মাধ্যমে ২০১৯ সালে মে মাসে পোল্যান্ড বর্ডার দিয়ে ইউরোপ প্রবেশের সময় ইউক্রেন্ট পুলিশ রাফিকে ধরে জেল হাজতে প্রেরণ করে। সেখানে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে বিনা চিকিৎসায় গত শুক্রবার মৃত্যুবরণ করে। সাথে সাথে তরুণের স্বপ্নেরও মৃত্যু হয়েছে।
এই হতভাগ্য তরুণ কয়েছ আহমদ রাফি সিলেট সদর উপজেলার লামাকাজির লালারগাঁও গ্রামের আমির আলীর ছেলে।
রাফির পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে ২০১৬ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় পাড়ি জমান বেলারুশে। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে রাশিয়া হয়ে ইউক্রেন প্রবেশ করে রাফি। দালাল বলছিল ইউক্রেন থেকে ইউরোপ ঢুকা খুবই সহজ। এরপর কয়েক দফায় দালালেরা তাঁকে ইউরোপ পাঠানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
মৌলভীবাজারের দালাল আব্দুল্লাহ ইউক্রেনের কিভ শহর থেকে রাফিকে লেবিব শহরে নিয়ে আসে ইমিগ্রেশন পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেয়। ইমিগ্রেশন পুলিশ রাফির পকেট থেকে সব ডলার নিয়ে ছেড়ে দেয়। সে আবার কিভ শহরে চলে আসে।
২০১৯ সালে মে মাসে ইউক্রেনে পারমানেন্ট কাগজধারি এক দালাল সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার চৌধুরীগাঁও (ছদরিগাঁও) গ্রামের মন্তাজ আলীর ছেলে মোঃ মাসুদ আহমদ তুষারের মাধ্যমে ইউক্রেন্ট থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় পোল্যান্ড এর বর্ডারে ধরা পড়লে রাফি ইউক্রেনে ফিরে আসে। এ সময় রাফির সাথে কোন কাগজপত্র না থাকায় ইউক্রেন্ট পুলিশ তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করে।
রাফিকে জেল থেকে বের করার জন্য বাংলাদেশ থেকে ১ লক্ষ টাকা এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী এক খালার কাছ থেকে উকিলের খরচ বাবত আরো ২ শ ডলার তুষারকে দিলেও তুষার টাকা নিয়ে তাকে জেল থেকে বের করেনি। যার ফলে রাফিকে ১৪ মাস জেল কাটতে হয়েছে।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে রাফি জেলে (ক্যাম্প) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরে। তাকে ক্যাম্পের ডাক্তার চিকিৎসা করে জানায় তার যক্ষা আর লিভারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাকে ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ আলাদা রুমে বন্দী করে রাখে। এর মধ্যে তার মুক্তি হয় কিন্তু তাকে ইমিগ্রেশন পুলিশ ছাড়েনি কারণ তুষার চুক্তির টাকা পুলিশকে বা উকিলকে দেয়নি তাই।
এদিকে সে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় দ্রুত জেল কর্তৃপক্ষ রাফিকে হাসপাতালে ভর্তি করে। রাফির এক বন্ধু মার্চ মাসে হাসপাতালে দেখা করতে গেলে রাফি জানায় সে তুষারের কাছে ১ লক্ষ টাকা পায়। সে টাকা গুলো দিলে তার চিকিৎসা হত। ইতিমধ্যে তার এক হাত ও পা অচল হয়ে যায়। ডাক্তার জানায়, নিয়ম অনুযায়ী যা যা ফ্রি চিকিৎসা করার তারা করবে কিন্তু দামী ঔষধ কিনার জন্য টাকা দিতে হবে।
এদিকে তুষার ১ লক্ষ টাকা ফিরত দেয়নি, উল্টো দালাল তুষার একদিন রাফিকে হাসপাতালে দেখতে যায় এবং তার সাথে কিছু ছবি তুলে। উক্ত ছবি তার পরিবারকে দিয়ে রাফির চিকিৎসার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
পরিবারের কাছ থেকে লাখ টাকা নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যে বসবাসরত রাফির আত্মিয় স্বজনের কাছ থেকেও আরো বেশ কিছু টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে তুষারের কাছে। তার মধ্যে খালা রহিমা খাতুন ৩ শ ৫৩ ডলার, খালাতো বোন নাজমিন ১ শ, ৯০ পাউন্ড, মামা একরাম ৩শ ৬১ ইউরো, সব শেষে রাফির খাওয়া দাওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে আরো ২০ হাজার টাকা নিয়েছে তুষার। অথচ একটা টাকাও রাফির চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেনি দালাল তুষার। মেডিকেল থেকে লাশ নেওয়া ও দাফন কাপন বাবত আরো সাড়ে ৭ শ ডলার পাঠানো হয়।
দুঃখের বিষয় লাশ দাফনতো দূরের কথা রাফি মারা যাওয়ার পর তার ধারে কাছেও যায়নি তুষার, বরং ইউক্রেনের যে হাসপাতালে রাফি মারা যায় সে হাসপাতালের সেবিকাসহ আরোও কয়েকজনকে দিয়ে ফোন করিয়ে বলে মেডিকেল থেকে লাশ ছাড়িয়ে নিয়ে হলে সেবিকার মাধ্যমে নিতে হবে নইলে সমস্যা হবে। তাদেরকে কিছু টাকা দিলে তারা লাশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে। এসবের দিকে কান না দিয়ে রাফির পরিবার অন্য মানুষকে দিয়ে দাফনের কাজ সম্পন্ন করিয়েছেন।
ইউক্রেনে বাঙালি কমিউনিটি তেমন ভালো নয়। রাফিও কোন পুরাতন বাঙালিকে ফোন করে বলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু তুষার চাইলে সব চিকিৎসা করাতে পারত। তার কাছে রাফির যা টাকা ছিল সেগুলো দিয়ে রাফির ভালো চিকিৎসা হত। এভাবে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় সে মারা যেত না।
রাফি মারা যাওয়ার কয়দিন আগে ফজলু নামের একজনকে ফোন করে তার অবস্থা জানায়। তিনি তার পরিবারের সাথে আলাপ করেন তার চিকিৎসার জন্য কিন্তু এই সুযোগটা আর হয়নি। গত ১৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে ডাক্তার ফজলু মিয়াকে ফোন করে জানায় যে রাফিকে আইসিউতে ভর্তি করা হচ্ছে। তারা যেন টাকার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু গত ১ মে শুক্রবার ডাক্তার ফোন করে রাফি আর নেই।
রাফির মৃত্যুর জন্য তুষার দালাল দায়ী। আজকে যদি সে টাকাগুলো না মারত তাহলে হয়তবা রাফি ইউরোপের স্বাদটা অনুভব করে মরত। এই তুষারে কাছে অনেক ছেলে টাকা পায়। তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলেন তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তুষারের বিচার চাই। আর যেন কোন রাফি এভাবে তুষারদের মত দালালের কারণে মরতে না হয়।
রাফির পিতা-মাতা সন্তানের করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তারা প্রশাসনের কাছে দালাল মোঃ মাসুদ আহমদ তুষারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন। জানা গেছে গত কয়েক বছরে দলালের খপ্পরের পরে সিলেটের প্রায় অর্ধ শতাধিক যুবক প্রাণ হারিয়েছে।