October 23, 2021

Sylhet Amar Sylhet

www.sylhetamarsylhet.com

‘মুজিব আমার পিতা’ অ্যানিমেশন মুভির একটি অংশ। ছবি: সংগৃহিত

‘মুজিব আমার পিতা’ অ্যানিমেশন মুভি, ভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া

‘স্কুলে পড়তে পড়তে আব্বার ব্যারিব্যারি রোগ হয়, চোখ খারাপ হয়ে যায়। চার বছর লেখাপড়া বন্ধ থাকে।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে এভাবেই শুরু হয় ‘মুজিব আমার পিতা’ অ্যানিমেশন মুভি।

মুজিববর্ষে শিশুদের কাছে আরো সজীব ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের জন্য আইসিটি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চলছে এই অ্যানিমেশন মুভির কাজ।

মুভির প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন নদীঘেষা এক গ্রাম থেকে যেখানে শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক ও নদীর কলকল ধ্বনি। সেখানে কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর। কিন্তু ব্রিটিশ শোষণের অধীনে তৎকালীন সেই পরিবেশ সঠিকভাবে তুলে ধরতে উপস্থাপন করা হয়েছে একটি অনুন্নত, শোষিত দেশের চিত্র, যখন আমাদের গ্রামগুলোতে লাগেনি আধুনিকতার

অ্যানিমেশন মুভিতে নিজ দেশের মানুষের জন্য কিশোর মুজিবের উত্তেজিত কণ্ঠ ছিলো। সেখানে ভরাট কণ্ঠে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কণ্ঠে ওঠা প্রশ্ন ‘তোমার নাম কী?’ এবং উত্তরে তরুণ মুজিবের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠের উত্তর, ‘শেখ মুজিবুর রহমান’। সবখানে চেষ্টা ছিলো সেই সময়কে নিখুঁত ফ্রেমে উপস্থাপনের। এমনকি রাতের দৃশ্যে আবহ গ্রাম বাংলায় শুনতে পাওয়া ঝিঝি পোকার শব্দ ও পেঁচার ডাকও বাদ যায়নি।

এই চলচ্চিত্রে ১৯২০ সালে জন্মানো শিশু মুজিব থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠা শেখ মুজিবুর রহমানকে তুলে ধরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটির ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হচ্ছে অ্যানিমেশন মুভিটি। কিন্তু তৎকালীন সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন ছিলো দীর্ঘদিনের গবেষণা। আর সে কারণেই এই অ্যানিমেশন মুভি নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথম ১ বছর চলে যায় শুধু গবেষণায়।

ফিল্মটির স্ক্রিপ্ট, স্টোরিবোর্ড, চরিত্র ও দৃশ্যপট কি হবে তা নিয়ে চলে এই গবেষণা। ১৯২০ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত এই সময়কাল তুলে ধরতে আশ্রয় নেয়া হয়েছে তখনকার মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই ও প্রবন্ধের। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটির ওপর ভিত্তি করে মুভিটি নির্মিত হলেও এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির শরণাপন্নও হয়েছে নির্মাতা। দৃশ্যপট তৈরি, নকশা ইত্যাদি তৈরি করা হয় ট্র্যাডিশনাল প্রক্রিয়ায়।

বাইগার নদীর তীরে টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মানো খোকা কিভাবে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখাতে পারে সেই পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে নির্মিত এই অ্যানিমেশন মুভি বঙ্গবন্ধুকে ও তৎকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতি জানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান এর পরিচালক সোহেল মোহাম্মদ রানা।

তিনি বলেন, ‘মুজিব আমার পিতা’ অ্যানিমেশন ফিল্মটি তৈরিতে নির্ভুল গবেষণা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো। কারণ এখানে যেমন জড়িত আছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার দায়িত্ব, তেমনি প্রয়োজন আছে তৎকালীন দৃশ্যপট তুলে ধরার দায়বদ্ধতা। অ্যানিমেশন ফিল্মে নির্মাতারা অনেকক্ষেত্রে নিজেদের কল্পনা বা আইডিয়াকে স্থান দেন। কিন্তু ইতিহাসভিত্তিক নির্মাণে সেই সুযোগ থাকে না। এখানেই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা আমাদের মূল উৎস ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটিতেই সীমাবদ্ধ থাকিনি, বরং সেখানে উল্লেখিত ঘটনাবলীকে নিরীক্ষার জন্য অন্যান্য স্বীকৃত বইয়ের সাহায্যও নিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, ব্যাকগ্রাউন্ড বা দৃশ্যপট নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাস্তবিক দৃশ্য তৈরি যাতে দর্শকেরা সেই সময়ের পরিবেশকে দৃশ্যপট দেখে অনুভব করতে পারেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ের দৃশ্যপটের বিবরণ খুবই সীমিত পর্যায়ে পাওয়া যায় ঐতিহাসিক বই বা চলচ্চিত্রে। আর সে কারণেই আমাদের এত সময় লেগেছে। ফিল্মটির চরিত্র চিত্রায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বঙ্গবন্ধু, তার কন্যা শেখ হাসিনা ও অন্যান্য চরিত্রের পুরোনো ছবি। এ ছাড়াও পোশাক, বাচনভঙ্গি, চলাফেরা ইত্যাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরনো ভিডিও, তথ্যচিত্র, সাক্ষাতকারের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

‘নকশা ও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা বিখ্যাত কিছু অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত যার ফলে ঐতিহাসিক বিবরণ থাকলেও আধুনিক অ্যানিমেশন ফিল্মের গঠন প্রক্রিয়া এই ফিল্মে পাওয়া যাবে।’-বলেন মুভিটির পরিচালক সোহেল মোহাম্মদ রানা।

এ সময় বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে তিনি বলেন, সবচাইতে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ট্র্যাডিশনাল অ্যানিমেশন পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে ‘টু-ডি’ বা দ্বিমাত্রিক এই মুভির জন্য প্রায় ৩০ হাজারের বেশি ছবি আঁকতে হচ্ছে। কেননা প্রতি সেকেন্ডে এখানে ১২টি করে ফ্রেম থাকে। আর বাংলাদেশে নির্মিত এমন অ্যানিমেশন মুভি এটাই প্রথম। যেখানে আইসিটি মন্ত্রণালয়, প্রোল্যান্সার স্টুডিও এবং বিএমআইটি স্যলুশন লিমিটেড একত্রে কাজ করছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চা, সংস্কৃতি ও আদর্শ নির্মাণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৈশোরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি, যৌবনে স্বাধিকার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাসকশ্রেণীর চক্ষুশূল হয়ে জেল-জুলুম সহ্য করা, এর মাঝেও দলের প্রতি দেশের নিপীড়িত মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালনের যে তাড়না বঙ্গবন্ধু অনুভব করেছেন এবং বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন তার কথা আমরা জানতে পারি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই ও প্রবন্ধে।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে প্রোল্যান্সার স্টুডিও এর নির্মাণ ‘মুজিব আমার পিতা’ নামক দ্বিমাত্রিক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি। ২০২০ সালের মুজিববর্ষকে সামনে রেখে নির্মিত হচ্ছে ‘মুজিব আমার পিতা’ নামে একটি অ্যানিমেশন ফিল্ম। শহীদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে প্রথম কথোপকথন থেকেই শুরু হয় মুজিবের রাজনৈতিক পথচলা। এখানে মুলত প্রাধান্য পাচ্ছে তাঁর শৈশব থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত সময়কাল।

আইসিটি মন্ত্রণালয়ের গেম অ্যান্ড অ্যাপ প্রজেক্টের আওতায় বিএমআইটি সল্যুশনের সহযোগিতায় প্রোল্যান্সার স্টুডিওতে ৪০ জনেরও বেশি চারুশিল্পী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ‘মুজিব আমার পিতা’ নামক দ্বিমাত্রিক অ্যানিমেশনটি দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে।অ্যানিমেশনটির পরিচালনা করছেন সোহেল মোহাম্মদ রানা, লিড ক্যারেক্টার ডিজাইনার আরাফাত করিম, লিড ব্যাকগ্রাউন্ড ডিজাইনার পল্লব কুমার মোহন্ত ও চিত্রনাট্য লিখেছেন ফাহাদ ইবনে কবির ও চিশতি কানন।