সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য মিডওয়াইভস

## ডাঃ তানভীরুজ্জামান ##

 

মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে মিডওয়াইফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ইউএনএফপিএ, জাপাইগো ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় মিডওয়াইফারি নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে মিডওয়াইফেরা তাঁদের কাজ শুরু করেছেন। এর সুফল আমরা পাচ্ছি। প্রত্যেক নারীর গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও জন্মপরবর্তী সময়ে মানসম্পন্ন মিডয়াইফারি সেবার বিকল্প নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো বেশির ভাগ গর্ভবতী মা বাড়িতে সন্তান প্রসব করেন। এরা অনিরাপদভাবে অদক্ষ সেবাদানকারীর সাহায্য নেন। তাই মা ও শিশুর জীবেন ঝুঁকি থাকে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে দক্ষ মিডওয়াইফের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে দক্ষ মিডওয়াইফের মাধ্যমে প্রসবের হার এখনো অনেক কম। কিন্তু দক্ষ ও পেশাদার মিডওয়াইফ মা ও নবজাতকের মৃত্যুরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একজন মিডওয়াইফ জানেন অন্তঃসত্ত্বা মা ও নবজাতকের অবস্থার অবনতি হলে কীভাবে তা শনাক্ত করবেন। একজন মিডওয়াইফ অস্ত্রোপচার ছাড়াই সমস্যার সমাধানে সহায়তা করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি জানেন, কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে মা ও নবজাতককে পাঠাতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ধাত্রীবিদ্যাকে সভ্যতার মাপকাঠি বলা হয়। যে জাতির মা ও শিশু যত স্বাস্থ্যবান এবং নিরাপদ, সে জাতি তত উন্নত। আমরা ধাত্রীসেবার ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল না পেলেও এখন এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান উভয় পক্ষ কাজ করছে। ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করব।ধাত্রীসেবাকে অনেক বড় করে দেখতে হবে। এটি একটি মহান কাজ। ধাত্রীরা হবেন গুণী মানুষের অংশীদার। তাই সবার চেষ্টায় মিডওয়াইফারি পেশাকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
মাতৃমৃত্যু রোধে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। ১৯৯০ সালে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মারা যেতেন ৫৭৪ জন মা। ২০১০ সালে সেটা নেমে এসেছে ১৯৪ জনে। জাতিসংঘের ২০১৩ সালের ধারণামতে, বাংলাদেশে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মারা যাচ্ছেন ১৭০ জন মা। মাতৃমৃত্যু রোধের এসব পরিসংখ্যান বাংলাদেশকে অনেক আশাবাদী করে তুলেছে। কিন্তু এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। বিশেষ বিশেষ এলাকায় মাতৃমৃত্যুর হার বেশি। এই এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। মাতৃমৃত্যুর তিনটি উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। যেমন: এক. রক্তক্ষরণ, দুই. উচ্চ রক্তচাপ, তিন. বাধাগ্রস্ত জন্ম। এ তিনটি কারণই প্রতিরোধযোগ্য।
মা যদি সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে থাকেন, তাহলে মাতৃমৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ তিনটি কারণকে প্রতিরোধ করতে পারলে দেশে জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমে আসবে। হাসপাতালে প্রসব হচ্ছে ৩৭ শতাংশ মায়ের। আর দক্ষ সেবাদানকারীদের মাধ্যমে ৪২ শতাংশ মায়ের প্রসব হচ্ছে। ৬৩ শতাংশ মা বাড়িতে প্রসব করছেন। এঁরা খুবই অদক্ষ ধাত্রী দিয়ে প্রসবের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করছেন।
হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার অধিকাংশই গ্রহণ করছেন ধনীরা। মাত্র ৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এ সেবা নিচ্ছেন। এই দরিদ্র মানুষের কাছে আমাদের যেতে হবে। তাঁদের কাছে কীভাবে সেবাটি পৌঁছানো যায়, সে চেষ্টা করতে হবে। এ চ্যালেঞ্জটি নিতে পারলে মাতৃমৃত্যুর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি ঘটবে। শিশুবিবাহ বন্ধ হলে মাতৃমৃত্যুর হার কমবে। আবার শিশুবিবাহ হলেও যদি তাদের গর্ভধারণ দেরি করা যায়, তাহলেও মাতৃমৃত্যুর হার কমবে। মিডওয়াইফরা এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
মিডওয়াইফ এখন আন্তর্জাতিকভাবে জায়গা করে নিয়েছে। একজন মিডওয়াইফ মায়ের গর্ভধারণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব অবস্থার সঙ্গী। একজন মিডওয়াইফ জানেন মায়ের কখন কী পরিবর্তন হচ্ছে। মিডওয়াইফ নিজেও একজন নারী। বিশ্বের সব নারীরই প্রজনন ও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নারী সেবাদানকারী পছন্দ। আর এ ক্ষেত্রে মিডওয়াইফরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ যেন থাকেন, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পর্যায়ক্রমে তিন হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ হবে। গ্রামীণ পরিবেশে থেকে তাঁদের সেবার নিশ্চয়তা দিতে হলে নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিতে হবে।

লেখক : ডাক্তার ও টেকনিকাল অফিসার, জাপাইগো। মোবাইল : ০১৭১২ ০৭৯৪৪০