অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা গোটা মানব জাতি হত্যার শামিল

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
অন্যায়ভাবে হত্যা করল অথবা পৃথিবীতে সন্ত্রাস সৃষ্টি করল সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করল। প্রত্যেক জাতিরই একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা থাকে যা দিয়ে তার পরিচয় ফুটে ওঠে। এ পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জাতির উত্থান-পতন ঘটেছে। একটি জাতি যখন তাদের মূল আদর্শের সঠিক চর্চা করে তখনই তাদের উত্থান ঘটে। এর বিপরীতে যখন তারা তদের মূল আদর্শ থেকে দূরে অবস্থান করে তখনই তাদের জন্য পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
মুসলিম জাতির উত্থানের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। প্রথম দিকে তাদের সংখ্যা একেবারে কম হলেও আদর্শে ছিল পরিপূর্ণ। এ আদর্শ তারা যতদিন পর্যন্ত লালন করেছে ততদিন তারা ছিল শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী জগদ্বিখ্যাত। তাদের মহান আদর্শের কথা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সবাই সাদরে গ্রহণ করে নেয় একান্ত আগ্রহচিত্তে। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, চিন্তা-দর্শন সবই ছিল অভূতপূর্ব ঐতিহ্যের। ক্ষমতা কিংবা স্বার্থপরতার লোভ তাদের আদর্শ থেকে চুল পরিমাণও নড়াতে পারেনি। তাদের মনীষীরা ছিলেন বিভিন্ন প্রতিভার অধিকারী। ইবনে সিনা, জাবের ইবনে হাইয়ান ও আল-বেরুনিসহ মুসলিম পণ্ডিতরা ছিলেন একদিকে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, গণিতজ্ঞ, ঐতিহাসিক, দার্শনিক সাহিত্যিক অন্যদিকে তাফসিরকার, হাদিস বিশারদ, ফকিহসহ জাগতিক ও পারলৌকিক বিভিন্ন জ্ঞানের অধিকারী। বিশ্ববাসীর কাছে তারা হয়েছে অনুকরণীয় মডেল। তাদের মানবতার প্রতি দরদ, সহনশীলতা, উদারতা, পরোপকার, নতুনত্ব, আবিষ্কার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্বকে আলোকিত করার মানস বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।
তাদের পরিচয় সম্পর্কে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে- ‘দয়াশীল আল্লাহর বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের যখন অজ্ঞলোকেরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে, ‘সালাম’ (তোমাদের জন্য শান্তি এবং অযথা তর্কে লিপ্ত হওয়া) এবং তারা রাত অতিবাহিত করে, তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত ও দণ্ডায়মান হয়ে।’ (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩-৬৪)।
যতদিন পর্যন্ত তারা এ আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল ততদিন পর্যন্ত তারা শ্রেষ্ঠ ছিল। যখনই তারা তাদের নিজ আদর্শের কথা ভুলে গিয়ে ক্ষমতা আর স্বার্থপরতার জালে আবদ্ধ হতে শুরু করে ঠিক তখনই তাদের ঐতিহ্যে কলংকের ছাপ লাগে। মুসলমানদের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও কমেছে তাদের আদর্শ ও ঐতিহ্য। কালের আবর্তনে আজ তারা তাদের নিজ আদর্শ ও ঐতিহ্য থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। ফলে তাদের ইতিহাসে যোগ হয়েছে- অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, সংঘাত, সংঘর্ষসহ অশান্তির বহু কলংকময় অধ্যায়ের। আজ তারা অলসতা, অজ্ঞতা ও ভোগবিলাসে লিপ্ত। তাদের এ দুর্দশা সম্পর্কে কোরআন বহুবার সতর্ক করেছে। যারা আমার আয়াতগুলোকে এড়িয়ে চলবে আমি তাদেরকে অচিরেই এর পরিণামস্বরূপ কঠিন শাস্তিতে শায়েস্তা করব।’ (সূরা আন আম ৬:১৫৭)।
আরও বর্ণিত হয়েছে- ‘তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দাংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দাংশ অবিশ্বাস কর? অতএব তোমাদের মধ্যে যারা এ রকম করে তাদের পার্থিব জীবনে দুর্গতি ব্যতীত কিছুই নেই এবং পরকালে তারা কঠোর শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে।’ (সূরা বাকারা ২:৮৫)। ‘ওহে মুমিনগণ! তোমরা পূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ কর না।’ (সূরা বাকারা ২:২০৮)।
উল্লিখিত আয়াতে কারিমার প্রমাণ বহন করে যে, মুসলিম জাতির অধঃপতনের একমাত্র কারণ হল কোরআনের অনুসরণ না করা। মুসলমানদের অধঃপতনের কারণ শুধু কোরআনকে ছেড়ে দেয়াই নয় বরং নবীর আদর্শ অমান্য করাও আরেকটি কারণ। আল্লাহর বাণী- ‘সুতরাং যারা তার (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসবে অথবা তাদেরকে কঠিন শাস্তি গ্রাস করবে।’ (সূরা নূর ২৪:৬৩)।
আজ এক মুসলমান অপর মুসলমানের সম্পদ ছিনিয়ে নিচ্ছে, পরস্পর হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হচ্ছে। অথচ মানব হত্যা মহাপাপ বলে কোরআনে ঘোষণা দেয়া হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল অথবা পৃথিবীতে সন্ত্রাস সৃষ্টি করল সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করল।’ (সূরা মায়িদা ৫:৩২)। পারস্পরিক মতানৈক্য, হিংসা-বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা সংকীর্ণ মানসিকতা এসব কিছুই ইসলামবিরোধী। অথচ এগুলোই আজ মুসলিম জাতির জীবনসঙ্গী।
ইসলামের মহান আদর্শের কথা আজও বিশ্ববাসী অকপটে স্বীকার করে। বিখ্যাত দার্শনিক ‘জর্জ বার্নার্ড শ’ বলেন- ‘মুহাম্মদের ধর্মের (ইসলামের) প্রতি আমি সব সময় সুউচ্চ ধারণা পোষণ করি। কারণ এর চমৎকার প্রাণবন্ততা। আমার কাছে মনে হয় এটাই একমাত্র ধর্ম যেটা সদা পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গীভূত হওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা প্রত্যেক যুগেই মানুষের হৃদয়ে আবেদন রাখতে সক্ষম।’ (স্যার জর্জ বার্নার্ড শ : দি জেনুইন ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৮ প্রকাশ ১৯৩৬)। কিন্তু আজকের মুসলমানদের অবস্থা দেখে বিশ্ববাসী ইসলাম নিয়ে নানা মন্তব্য করে। অথচ ইসলাম ও মুসলিম বিপরীত দুই প্রান্তে অবস্থান করছে। ফলে তারা শকুনের শিকারে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হল পবিত্র কোরআন শরীফের বিধান ও হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ লালন করা।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে আমল করার তৌফিক দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক : প্রিন্সিপাল শাহজালাল রহ, ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট।

 

Chat Conversation End