সদকাতুল ফিতরের ফজিলত ও আদায়ের পরিমাণ

:: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী :: 

সদকাতুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যা রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করতে হয়। আমাদের এ অঞ্চলে তা ‘ফিতরা’ নামে পরিচিত। হজরত রাসূলে কারিম (সা.) তা আদায়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন এবং এর নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিয়েছেন।

সদকাতুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদ আদায় করতে হয়। আমাদে এ কারণেই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ ইসলামের অন্যান্য মৌলিক আমল ও ইবাদতের ন্যায় সদকাতুল ফিতরও নিয়মিত আদায় করে আসছে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন, অনর্থক অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার যোগানোর জন্য। -সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯

হজরত জারির (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রমজানের রোজা সদকাতুল ফিতর আদায় করার পূর্ব পর্যন্ত আসমান-জমিনের মাঝে ঝুলন্ত থাকে। -আত তারগিব ওয়াত তারহিব: ২/৯৬

সদকাতুল ফিতর আদায়ের পরিমাণ
সদকাতুল ফিতর আদায়ের পরিমাণ সম্পর্কে হাদিসে দু’টি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা হচ্ছে, (‘সা’) ও (নিসফে সা’)। খেজুর, পনির, জব ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’= ৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়), অর্থাৎ ৩ কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। আর গম দ্বারা আদায় করলে ‘নিসফে সা’= ১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম বা ১.৬৩৫৩১৫ কেজি (প্রায়), অর্থাৎ ১ কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি প্রযোজ্য হবে। -আওযানে শরইয়্যাহ পৃ. ১৮

বাংলা সের হিসেবে ১ সা’-এর পরিমাণ ৩ সের ৬ ছটাক এবং আধা সা’-এর পরিমাণ ১.৫ সের ৩ ছটাক। -কিতাবুন নাওয়াযেল ৭/২৪৩

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হরজত রাসূলুল্লাহ (সা.) একজন ঘোষক প্রেরণ করলেন যেন মক্কার পথে পথে সে যেন এ ঘোষণা করে যে, জেনে রেখো! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় সকলের ওপর সদকায়ে ফিতর অপরিহার্য। দুই মুদ (আধা সা) গম কিংবা এক সা অন্য খাদ্যবস্তু। -জামে তিরমিজি: ১/৮৫

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রমজানের শেষ দিকে বসরার মিম্বারের ওপর খুতবা দানকালে বলেছেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় প্রত্যেকের ওপর অপরিহার্য করেছেন এক সা খেজুর বা জব কিংবা আধা সা গম। -সুনানে আবু দাউদ: ১/২২৯

উপরোক্ত খাদ্যবস্তুর পরিবর্তে সেগুলোর মূল্য আদায় করারও অবকাশ রয়েছে। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটিকে মাপকাঠি ধরে তার নির্ধারিত পরিমাণ যথা- ‘সা’ বা ‘নিসফে সা’ এর বাজারমূল্য আদায় করলেও সদকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে। -রদ্দুল মুহতার: ২/৩৬৬

এখানে স্মর্তব্য যে, মূল্যের দিক থেকে ওই খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে যেহেতু তফাৎ আছে, তাই সবচেয়ে কম দামের বস্তুকে মাপকাঠি ধরে কেউ যদি সদকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলেও আদায় হায়ে যাবে। বর্তমান বাজার দর হিসাবে যেহেতু গমের দামই সবচেয়ে কম, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর আধা ‘সা’ গমকে মাপকাঠি ধরে ওই সময়ের বাজার-দর হিসাবে তার মূল্য ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করা হয়। কেননা ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ সেটিই, যা হাদিসে উল্লিখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে পরিমাণ ও বাজার-দরের বিচারে সর্বনিম্ন। টাকার অংকে সর্বনিম্ন ফিতরা এই মানদন্ডের ভিত্তিতেই হবে।

তবে উত্তম হলো, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তুকে মাপকাঠি ধরে সদকাতুল ফিতর আদায় করা। কেননা সদকার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হলো, গরীবদের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ। এর পাশাপাশি আদায়কারীর সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রাখা হয়। অতএব এ দিক বিবেচনায় সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তু যথা এক ‘সা’ খেজুর, পনির ও কিশমিশ ইত্যাদিকে মাপকাঠি ধরে সদকাতুল ফিতর আদায় করা বাঞ্ছনীয়।

মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে সদকাতুল ফিতরা আদায় করার তৌফিক দান করুন।

আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক: প্রিন্সিপাল শাহজালাল রহঃ ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট।