মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বেঁচে থাকাকালীন ঈদের দিনের একটি শিক্ষনীয় ঘটনা!

:: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী ::

 

আমাদের প্রিয় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছিলেন একেবারেই এতিম। এতিম ছিলেন বলেই তিনি বুঝতেন এতিম ও অসহায়দের মনের কষ্ট। জীবনের কষ্ট। কাজের কষ্ট। তাদের সকল কষ্টই তিনি অনুভব করতেন একান্ত হৃদয় দিয়ে। ফলে তাদের সেসব কষ্টের তুষার দূর করার জন্য রাসূল (সাঃ) সকল সময় থাকতেন ব্যাকুল। তাদের প্রতি ছিল তাঁর বিশাল হৃদয়। আকাশের মতো, তার চেয়েও বিশাল। বিশাল ছিল তাঁর মন ও ভালোবাসার দরিয়া। সেখান থেকে উঠে আসতো দরদের তুফান। মমতার ঢেউ। সেই ঢেউ আছড়ে পড়তো নবীর (সাঃ) চারপাশে। সকলের হৃদয়ের দু’কূল ছাপিয়ে যেত রাসূলের (সাঃ) ভালোবাসার কোমল তুষারে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা সেতো এক মহৎ গুণ! মানুষকে ভালোবাসতেন রাসূল (সাঃ) মন দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, জীবন দিয়ে।

কিন্তু এতিম, গরিব, দুস্থ এবং অসহায়দের প্রতি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, ভালোবাসার মাত্রাটা ছিল অনেক- অনেক গুণে বেশি। যার কোনো তুলনাই হয় না। সেই ভালোবাসার নজির তো রয়ে গেছে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, জীবনেই। তাঁর জীবন-ইতিহাস যেমন শিক্ষণীয় তেমনই পালনীয়।

ঈদ মানেই তো খুশি আর খুশি। আনন্দের ঢল। সবার জন্যই চাই ঈদের আনন্দ। সমান খুশি। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? কিছু ব্যতিক্রম তো থেকেই যায়। যেমন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এর সময়ে এক ঈদে, নামাজ শেষে ঘরে ফিরছেন দয়ার নবীজী (সাঃ)। তিনি দেখলেন মাঠের এক কোণে বসে কাঁদছে একটি তুলতুলে কোমল শিশু। এই খুশির দিনেও কান্না! অবাক হলেন রাসূল (সাঃ)। তাঁর হৃদয়ের বেদনার ঢেউ আছড়ে পড়লো। রাসূল (সাঃ) ছেলেটির কাছে গিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। শিশুটি বললো, আমার আব্বা-আম্মা নেই। কেউ আমাকে আদর করে না। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। আমি কোথায় যাবো? এতিম নবী রাহমাতুল্লিল আলামিন। ছেলেটির কথা শুনে গুমরে কেঁদে উঠলো নবীজীর (সাঃ) কোমল হৃদয়। জেগে উঠলো তাঁর মর্মবেদনা। তিনি পরম আদরে শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। হযরত আয়েশাকে (রাঃ) ডেকে বললেন, হে আয়েশা! ঈদের দিনে তোমার জন্য একটি উপহার নিয়ে এসেছি। এই নাও তোমার উপহার। ছেলেটিকে পেয়ে দারুণ খুশি হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ)। দেরি না করে মুহূর্তেই তাকে গোসল করিয়ে জামা পরালেন। তারপর তাকে পেট ভরে খেতে দিলেন।

রাসূল (সাঃ) ছেলেটিকে বললেন, আজ থেকে আমরাই তোমার পিতা-মাতা। আমরাই তোমার অভিভাবক। কি, খুশি তো! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, কথা শুনে ছেলেটির চোখেমুখে বয়ে গেল আনন্দের বন্যা। এই ছিল এতিমের প্রতি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, ভালোবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত! রাসূল (সা) শুধু এতিমদের প্রতিই যে এমন সদয় ছিলেন, সহমর্মী ছিলেন তাই নয় তিনি তাঁর অধীনস্থদের প্রতিও ছিলেন সদা সজাগ ও দরদি। মায়া-মমতার চাদরে তাদেরকে আঁকড়ে রাখতেন। তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়, মনে যেন কোনোপ্রকার দুঃখ না থাকে দয়ার নবী (সাঃ) সেদিকে খেয়াল রাখতেন সর্বক্ষণ।

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, দু’জন খাদেম বা চাকর ছিলেন। একজন হযরত যাইদ ও আর একজন হযরত আনাস (রাঃ)। তাদের সাথে রাসূল (সাঃ) কখনোই মনিবসুলভ আচরণ করতেন না। কড়া ভাষায় কথা বলতেন না। খারাপ ব্যবহার করতেন না। মেজাজ দেখাতেন না। আদেশ কিংবা নির্দেশে কঠোরতাও দেখাতেন না। বরং আপন পরিবারের সদস্যদের মতই তাদের সাথে ব্যবহার করতেন। একই খাবার খেতেন। একই ধরনের জীবন-যাপন করতেন। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! আজকের দিনে যা কল্পনাও করা যায় না। হযরত যাইদের (রাঃ) কথাই বলি না কেন! ছোট্টবেলায় তিনি মা-বাপ থেকে হারিয়ে যান।

আল্লাহর রহমতে তার আশ্রয় হয় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, ঘরে। যখন তার পিতা-মাতার সন্ধান পাওয়া গেল, তখন তারা ছুটে এলো রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, কাছে। তারা তাকে নিয়ে যেতে চায়। রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার পিতা-মাতার সাথে যাবে? যাইদ (রাঃ) সাথে সাথেই বললেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, কাছ থেকে যে ব্যবহার আমি পেয়েছি, তাঁর কোনো তুলনা হয় না। তামাম পৃথিবী যদি আমাকে দেয়া হয় তবুও তাঁকে ছেড়ে আমি যেতে পারবো না। না, কখনোই যাবো না। হযরত আনাস (রাঃ)। তিনি আট বছর বয়সে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, খেদমতে এসেছিলেন। দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, খেদমত করেছিলেন।

সেই হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, দীর্ঘ দশ বছর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের,খেদমত করেছি। কিন্তু এই দশ বছরের মধ্যে কোন একটি দিনও রাসূল (সাঃ) আমাকে একটি কথাও ধমক দিয়ে বলেননি। এমনই ছিল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের,আচার- ব্যবহার। এমনই ছিল তাদের প্রতি তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসা। এমনই ছিল তাঁর উদারতা। ছিল দয়া ও মমতার অসীম সাগর। সাগরের চেয়েও অধিক। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, মতো এমনই হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে আমাদের। যে হৃদয় হবে ভালোবাসায় পূর্ণ। মমতায় টইটম্বুর। যে হৃদয় হবে আকাশের চেয়েও প্রশস্ত। সাগরের চেয়েও বিশাল। এমনই হৃদয় তৈরির জন্য প্রয়োজন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের,শিক্ষা গ্রহণ ও সৎ সাহসের। এ জন্যই আমাদের রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তাঁর পথেই চলতে হবে। তাঁর শিক্ষাই গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই কেবল সুন্দর, সার্থক ও সফল হবে আমাদের জীবন। আসুন আমরা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, ভালোবাসি। তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করি। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করি। তাঁরই দেখানো আলো ঝলমলে পথে সর্বদা চলি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন।

প্রিন্সিপালঃ- শাহজালাল রহ, ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট।