ইসলামের খেদমতে আল্লামা ফুলতলী (রহ:)

# মো:শামসুল ইসলাম সাদিক #

পবিত্র আল-কোরআনের সূরা মুযযাম্মিলের ৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেন- কোরআন আবৃত্ত করুন সুবিন্যস্থ ভাবে ও স্পষ্টভাবে।পবিত্র আল-কোরআন শেষ নবী রাসুলে পাক (সা:)-এর উপর অবতীর্ণ সর্বশেষ আসমানী কিতাব। এটি চির অবিকৃত। কারণ এর সংরক্ষক স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহুতালা। রাসুলে পাক (সা:)-এর উপর অবতারিত এ কিতাবের বিধি-বিধান ও শিক্ষাকে ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়িত করার পদ্ধতি যেমন দেখিয়ে গেছেন তেমনি এর বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের পদ্ধতিও শিখিয়ে গেছেন। সাহাবায়ে কিরামগণ রাসুলে পাক (সা:) থেকে তা শিক্ষা লাভ করেন। আল-কোরআনের ভাষা,শব্দার্থ ও শব্দাতীত তাৎপর্য ব্যঞ্জনা কোনোভাবেই কোনো কিছুর সাথে তুলনীয় নয়, তেমনি এর উচ্চারণভঙ্গি,পঠন-রীতিও অনন্য। তা নিজে থেকে শেখা যায় না, রপ্তও করা যায় না। এজন্য রাসুলে পাক (সা:)-এর কাছ থেকে সাহাবায়ে কিরাম যে পঠন-প্রক্রিয়া শিক্ষা করেছিলেন তারই অনুসরণ করতে হবে। যুগ পরিক্রমায় সাহাবায়ে কিরাম থেকে তাবিঈন,তাবে তাবিঈন হয়ে উলামায়ে কিরামের মাধ্যমে বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের এ ধারা অদ্যবধি চালু আছে। আমাদের ভারতী উপমহাদেশে আউলিয়ায়ে কিরাম,বুযুর্গানে দ্বীন ও পীর-মাশায়িখগণ এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন। এক্ষেত্রে জৌনপুরী সিলসিলার অন্যতম বুযুর্গ,হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছাহেব ক্বিবলাহ ফুলতলী (রহ:)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও বিশেষ অবদান রয়েছে।
হযরত আল্লামা ফুলতলী (রহ:) তাঁর পীর ও মুর্শিদ হযরত শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ:)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ইলমে শরী’আত ও ইলমে তরীকতের পাশাপাশি ইলমে কিরাতের সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছিলেন।তিনি মক্কা মুয়াযযামার মসজিদুল হারামের ইমামগণের পরীক্ষক,রঈসুল কুররা হযরত আহমদ হিজাযী মক্কী (রহ:)-এর ছাত্রত্ব গ্রহণ করে তাঁর নিকট থেকে সরাসরি ইলমে ক্বিরাতের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং এ উপমহাদেশে তাঁর শীর্ষতম সনদপ্রাপ্ত ছাত্র হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলন।
ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ও মানব জাতির মুক্তির সনদ পবিত্র আল-কোরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের শিক্ষা যথাযথভাবে বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে ছড়িয়েও দিয়েছেন। তিনি দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে এর মাধ্যমে ইলমে কিরাত-এর বৈপ্লবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন প্রায় অর্ধ শতাব্দী যাবত। বাংলাদেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য ও গ্রেট বৃটেনসহ ইউরোপের অনেক দেশে এবং সুদূর আমেরিকাতেও ইলমে ক্বিরাত প্রশিক্ষণের নিয়মিত কর্মসূচি তিনি আজীবন চালিয়ে গেছেন। জাতিয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আল-কোরআনের এমন খেদমতের তুলনা বিরল।
মুসলিম মিল্লাতের মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের খেদমতে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) যে নজির স্থাপন করে গেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত। কেননা পবত্রি আল-কোরআন সহীহ শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতের লক্ষ্যে তিনি ১৯৪০ সালে নিজ বাড়িতে বিশুদ্ধ কোরআন তিলাওয়াতের পাঠদান কার্যক্রম চালু করেন। পবিত্র আল-কোরআন সহীহ শুদ্ধভাবে পড়তে ছাত্র সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকলে তখন কেন্দ্র স্থাপন ও বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই সে লক্ষ্যে ১৯৫০ সালে ৭ সদস্য বিশিষ্ট্য বোর্ডগঠন করেন এবং বোর্ড সদস্যদের অনুরোধে তাঁর পিতার নামানুসারে কোরআন প্রশিক্ষণ নামকরণ করা হয় “দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাষ্ট”। এ ট্রাষ্টের মাধ্যমে সিলেটসহ সারা বিশ্বে পবিত্র আল-কোরআন সহীহ শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত মাধ্যমে প্রত্যেক ধর্মীয় মুসলমানের কাছে অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়। যার বাস্তব চিত্র আমরা পবিত্র রামাদ্বান মাসে স্বচোখে অবলোকন করতে পারি। বর্তমানে এই ট্রাষ্টের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ফুলতলী ছাহেব বাড়ি থেকে বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে এর কার্যক্রম সফলতার মধ্যদিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এই পবিত্র আল-কোরআনের খেদমত কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে ৩৩৩ একর জায়গা ট্রাস্টের নামে ওয়াক্বফ করে রেখে গিয়েছেন।
কোরআনের খেদমতের পাশা-পাশি হাদিস শরীফের খেদমতে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আল্লামা ফুলতলী (রহ:) ১৯৪৬ সনে বদরপুর আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং সেখানে ১৯৫০ সন পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সনে তিনি গাছবাড়ি আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন এবং পর্যায়ক্রমে ভাইস প্রিন্সিপাল ও প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সুদীর্ঘকাল তিনি সৎপুর আলিয়া মাদরাসায় ও ইছামতি আলিয়া মাদরাসায় হাদিস শরীফের পাঠদান করেছেন। শেষ জীবনে তিনি সপ্তাহে দুদিন ফুলতলী কামিল মাদরাসা,সোবহানীঘাট কামিল মাদরাসায় কামিল জামাতে বুখারি শরীফের পাঠদান করতেন।
আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এক জীবন্ত ইতিহাস, গৌরবের কিংবদন্তী। সত্য-ন্যায় এবং আহলে সুন্নাতওয়াল জামাতের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন,পাশা-পাশি জ্ঞানের আলো বিতরণে নিরলস চেষ্টা করেছেন। আল্লামা ফুলতলী (রহ:) তাঁর সমগ্র জীবন প্রবাহে জ্ঞানের প্রচার-প্রসার এবং সত্য সুন্দরের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এর চিন্তায় ও বিশ্বাসে অনিন্দ্য সুন্দর উপাসনা আর প্রখর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী সবার মাঝে ছড়িয়ে আছে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুণাবলি আমাদেরকে সঠিক পথ চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি ছিলেন একজন যুগ শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন। তাঁর আপাদমস্তক ছিল রাসুলে পাক (সা:) এর আদর্শে উদ্ভাসিত। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী প্রত্যেক নির্যাতিত, নিপীড়িত ,অবহেলিত এবং মজলুম মানুষের পক্ষে উচ্চ কন্ঠস্বর।
বিশেষ করে তিনি জালিম ও রাসুলে পাক (সা:) এর শক্রদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি তাগুতের বিরুদ্ধে তাঁর সময়োপযোগী এবং সাহসী কন্ঠ ছিল ধারালো তরবারির চেয়েও কঠোর। রাসুলে পাক (সা:) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত এ মহান ব্যক্তির মাঝে ছিল প্রেম, প্রীতি, ¯েœহের ও ভালোবাসার এক মধুর সুর, অনাচার নির্যাতনের এবং সকল বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক। তিনি কখনো ছিলেন কোমল আবার কখনো কঠোর এক প্রাচীর। ইসলাম প্রচারে তথা আল্লাহ তায়ালার দ্বীন কায়েম করতে এবং রাসুলে পাক (সা:) এর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় অগ্রসৈনিক।
ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এর চরিত্র,আচার-আচরণ ও ব্যবহার ছিল ন¤্রতা ও ভদ্রতায় পরিপূর্ণ। জীবনের ঊষালগ্ন থেকে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম জাতির ক্রান্তিকালের উত্তরণের চিন্তা মাথায় নিয়ে যারা সামনে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে দীপ্ত কঠিন শপথে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এর অভিযাত্রা অন্যতম। তিনি পবিত্র কোরআন ও হাদিসকে সামনে রেখে বাতিলের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যান।
কোরআন, হাদিস, ইজমা, ও কিয়াস সহ ধর্মীয় প্রত্যেক কিতাবের মর্মবাণী উপলব্ধি করে সফলতা ও কৃতিত্বের সাথে উপস্থাপন করে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাবিদের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ঈমান আক্বিদা রক্ষার আন্দোলনে তাকে পাওয়া যেত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো। আল্লামা ফুলতলী (রহ:) ছিলেন নিরহংকার, খোদাভীরু, শান্তিপ্রিয় ও একনিষ্ট রাসুল প্রেমিক। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম, হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যকার শান্তি সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ইসলামি চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে তিনি সু লেখক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও মিষ্টিভাষী আদর্শ সুবক্তা। তাঁর অন্যতম চিন্তার চেতনার হাতিয়ার আনোয়ারুস সালিকিন অথবা নালায়ে কলন্দর নামে কাব্যগ্রন্থ দু’টি বিশ্ব বরেণ্য কবিদের চেয়ে কম নয়?
এছাড়া পবিত্র আল-কোরআন সহিহ শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতের জন্য তাঁর অন্যতম একটি রচনা আল-কাউলুস ছাদীদ। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) কে ভাবিয়ে তুলেছিল অনেক। তাই প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত লতিফিয়া এতিমখানা, ফুলতলী কামিল মাদরাসা, সোবহানীঘাট কামিল মাদরাসা, বৃদ্ধানিবাস প্রকল্প, ফ্রি ডিসপেনসারী, লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাষ্ট, শিক্ষক সংগঠন জমিয়তুল মোদারিছীন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পবিত্র আল-কোরআন বিশুদ্ধভাবে পড়ার অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মীয় “দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাষ্ট” তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও অনেক অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে মুসলিম হৃদয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
ক্ষণস্থায়ী জীবনের ইতি ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তায়ালার তাঁর প্রিয় বান্দাদের কাছে আজরাঈল যখন হাজির হন তখন তাঁরা পরম আনন্দে রাব্বে কারিমের দিকে পাড়ি জমান। তিনিও রাব্বে কারিমের ডাকে ১৫ জানুয়ারি ২০০৮ সালের মঙ্গলবার দিবাগত রাতে প্রায় ২ টার দিকে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) রবের ইশারায় তাঁর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। জাতিয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বরেণ্য এই ব্যক্তির ইন্তেকালে দেশ-বিদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। চারদিকে শোকার্ত মানুষের ঢল। আপামর জনসাধারণ ছুটেছেন প্রিয় রাহবারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ফুলতলীর সেই বালাই হাওরের প্রান্তরে। ১৬ জানুয়ারি লক্ষ লক্ষ জনতা তাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মান জানাতে জমায়েত হতে থাকেন ফুলতলীর দরবার শরীফ। ভক্তদের আহাজারি আর কান্নায় ভারি হয় গোটা ফুলতলী বালাই হাওরের পরিবেশ। প্রিয় মুর্শিদের ইচ্ছা মোতাবেক তাকে নিজ বাড়ির মসজিদের উত্তর দিকে দাফন করা হয়।
চির অমর মহান এই ওলি এ পৃথিবীতে আর কখনো ফিরে আসবেন না। তিনি চলে গেলেও তাঁর লাখো লাখো অনুসারী রেখে গেছেন। ক্ষিপ্রগতি আর দীপÍ পদক্ষেপে তাঁর আদর্শবাহী সুন্নি কাফেলা চলছে অবিরাম মদিনা মনোয়ারার দিকে। যুগ শ্রেষ্ঠ এ ওলীয়ে কামিল আমাদের প্রেরণা ও চেতনা। চিরভাস্কর হয়ে অম্লান থাকবেন প্রত্যেক মুমিন হৃদয়ে এবং পুরো জাতির জন্য অনুসরণীয় হয়ে। রাব্বে কারিম যেন উনাকে জান্নাতের সু-উচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, এম. সি কলেজ, সিলেট। সহ-মুদ্রণ ব্যবস্থাপক, দৈনিক সিলেটের ডাক, মোবাইল নং ০১৭২৫-৭২৪৫০৮